*নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গরু পাচার থামছেই না*
*অপহরণ-ডাকাতি-চাঁদাবাজিতে আতঙ্কিত জনপদ*

ক্রাইম প্রতিবেদক:

বান্দরবানের পার্বত্য উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এখন কার্যত অপরাধীদের নিরাপদ করিডোরে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ঈদগড়-বাইশারী, রামু-ঈদগাঁও সড়কও যেন ডাকাতি এবং অপহরণ বানিজ্যের হটস্পট হয়েছে। সড়কে চলাচল করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনজীবন যেন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। গর্জনিয়া মাঝির কাটার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহীন ডাকাতের পরে রহিম ডাকাত ও বাইশারী মঘেরখিল এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ জুনু বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে ত্রাসের সাম্রাজ্য।

তাদের নেতৃত্বে প্রতিদিন এই সীমান্ত দিয়ে শত শত গরু অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে সীমান্ত পথে অস্ত্র চোরাচালানও বৃদ্ধি পেয়েছে। যা দিয়ে পার্বত্য উপজেলা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘটিত হচ্ছে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। গরু পাচারের পাশাপাশি এই সংঘবদ্ধ চক্রটি বাংলাদেশ থেকে আরাকান আর্মির কাছে রসদ সরবরাহ করে থাকে। বিনিময়ে তারা সীমান্তপথে অস্ত্র সংগ্রহ করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ঈদগড়, বাইশারী ও ঈদগাঁও-রামুর পাহাড়ি এলাকায় হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ জড়িয়ে পড়ছে, সংগঠিত হচ্ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম। গত দুই মাসে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। তবুও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল গর্জনিয়া মাঝির কাটার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহীন ডাকাতের হাতে। ২০২৫ সালের ৫ জুন তার গ্রেফতারের পর আধিপত্য চলে যায় আর কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপের হাতে। বর্তমানে সীমান্তের ২ বিজিবি থেকে বাইশারীর মূখ পর্যন্ত রহিম ডাকাতের নিয়ন্ত্রণে ও বাইশারী মঘেরখিল এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে জুনায়েদ প্র: জুনুর নেতৃত্বে বড়বিল ১নং ওয়ার্ডের মৃত শুক্কুরের ছেলে গুরামিয়া (৩৫), যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ও জোড়া খুন মামলার আসামি আলমগীর হোসেন ওরফে ভুলু (৩৬), নেজাম উদ্দীন, ওবায়দুল হক মনু এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী গিয়াস উদ্দিন (৩৩), মোঃ ছাবেকসহ আরও বেশকয়েকজন সন্ত্রাসীর আওতাধীন কক্সবাজারের রামু-ঈদগাঁও উপজেলার পাহাড়ী জনপদ ঈদগাঁও-ঈদগড় এলাকা।

তারা মায়ানমারে রসদের মাধ্যমে অস্ত্র, গরু ও মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গোপন সূত্রে জানা যায়- সাম্প্রতি জুনায়েদ বাহিনীর হাতে বিদেশি ভারী অস্ত্রের একটি চালান এসেছে। যাহ মায়ানমারের আরাকান আর্মির বলে ধারণা করছেন এলাকাবাসী। এবং এরকম ভারী অস্ত্র পুলিশ বাহিনীর কাছেও নেই বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক এলাকাবাসী। দেশী-বিদেশী অস্ত্রসহ ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রিত করে সন্ত্রাসী রাম রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন জুনায়েদ বাহিনী।

অপহৃতদের জিম্মি করে শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়, না ফেলে মেরে ফেলেছেন তারা। ডাকাতি অপহরের ভয়ে চরম আতংকে আছেন অত্র ইউনিয়নের লাখ লাখ অসহায় পরিবার। অভিযোগ রয়েছে- তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া প্রভাবশালী দলীয় ব্যক্তিদের অনেককে ডেকে নিয়ে দেশীয় তৈরি অস্ত্র দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে। তাই সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

সরেজমিন ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী- সীমান্ত দিয়ে পাচার হওয়া গরু প্রথমে নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন পথ হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হচ্ছে কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল এলাকা হয়ে জোয়ারিয়ানালা, খালিরছড়া দিকে যাওয়া পথ। সেখান থেকে গরুগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীদের দিয়ে দেওয়া হয়।

ঈদগড়-বাইশারী এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়- সড়কের ঢালাগুলোতে স্বাধীনার পর থেকেই ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, অপহরণসহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ড ঘটেই চলছে। কোন ভাবে তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছেনা। বরং দিন দিন আগের তুলনায় বেড়েই চলছে। দিনে কিংবা সন্ধ্যা অথবা রাতে যখন-তখন ডাকাতরা সড়কে চলাচলকৃত যাত্রীদের আটকিয়ে সব কিছু লুটে নিচ্ছে। শুধু তা নয় অপহরণ করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মুক্তিপন হিসাবে। টাকা পেতে দেরি হলে অনেক কে ব্যাপক মারধর করে বেশ কয়দিন টাকার জন্য জঙ্গলে আটকিয়ে রাখে। এছাড়া উক্ত সড়কে ডাকাতের গুলিতে অনেকে নিহতও হয়েছেন। আবার অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণও করেছেন। ডাকাত চক্রের কবল থেকে প্রশাসনের লোক, সাংবাদিকসহ অসহায় মানুষরাও রেহায় পাচ্ছেনা। একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে তাদের কাছে।

জুনায়েদ প্রঃ জুনু

অভিযুক্ত জুনায়েদ প্রঃ জুনুর কাছ থেকে এ-সব বিষয়ে চাইলে স্বীকার করে বলেন- স্থানীয় বাসিন্দা সবাই তো আমার মানুষ নয়, এছাড়া সবাই তো আমাকে ভালোবাসে না! আপনি বাইশারী বাজারে আসুন, কেউ যদি বলতে পারে ; যে শাস্তি আছে আমি মাতা পেতে নেবো।

ঈদগড় ফাঁড়ির আইসি খোরশেদ আলম তার এলাকার বিষয়ে বলেন- চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের বিষয়ে আমরা গভীর সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন- পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অপরাধী যে-ই হোক রেহাই পাবে না। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেশিদিন বাঁচতে পারবে না।

আজ সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের দাবি- অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করে সীমান্ত এলাকার চোরাচালান ও অপরাধচক্র দমন করা হোক। তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে সন্ত্রাসী বাহিনী ও জুনায়েদ বাহিনীর আর-ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দেখতে চোখ রাখুন দৈনিক মেহেদী পত্রিকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *