বিশেষ প্রতিবেদক:
গত বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর রমনা এলাকায় ৩ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে ডিবি (গোয়েন্দা) পুলিশের হাতে আটক হন কক্সবাজারের রামু উপজেলা উত্তর মিঠাছড়ি চা-বাগানের আষ্কর পাড়া এলাকার জানু বড়ুয়া ও সদরের খরুলিয়া হিন্দু পাড়া এলাকার নিরঞ্জন শর্মা। এই ঘটনার পর পরই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এদের নেপথ্যের নায়ক কে? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নেপথ্যের নায়কের নাম।
তিনি হলেন, কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া এলাকার মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদার হিসেবে পরিচিত শীর্ষ ইয়াবা ডন নুরুল আমিন প্রকাশ কালু। তার সিন্ডিকেটের প্রধান হলেন উখিয়ার সীমান্তবর্তী ঘুমধূম নয়া পাড়া এলাকার আব্দুল বারির ছেলে ইয়াবা গড ফাদার ফরিদ।
কালুর মাদক পাচার করতে গিয়ে তার ড্রাইভার জানু বড়ুয়া ও নিরঞ্জন শর্মা আটকের পর থেকে কালু দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। তবে তখনো থেমে যায়নি কালুর মাদক জগতের কর্মকান্ড। আত্মগোপনে থেকেও সিন্ডিকেটের অপরাপর সদস্যদের নিয়ে চালিয়ে গেছেন কোটি কোটি টাকার মাদক পাচার। আটকদের দাবি, কালুর ইয়াবা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন। সেসময় তারা মাদকের চালানটির গডফাদার কালুর নাম বল্লেও বিকাশের মধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ওই মামলা থেকে রক্ষাপান তিনি। কালুর নাম বলে দেয়ায় তাদের জামিনে ছাড়িয়ে নিতে কোন সহযোগীতা করেন নি এই মাদক গডফাদার।
কালু এবং তার মাদকের বন্ধু ফরিদের বিশ্বস্থ একজন এ প্রতিবেদককে নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ২০১০ সালের শেষের দিকে কালুর মাদকের বড় বড় কয়েকটি চালান চট্রগ্রামসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় আটক হন। এরপর থেকে কালু নিজেকে বাচাঁতে খরুলিয়া বাজারে একটি ফার্ণিচারের দোকান দিয়ে বৈধ ব্যবসায়ী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে। তাতেও কাজ না হওয়ায় একাধিক সিএনজি ও মিনিট্রাক ক্রয় করে নিজেক কোম্পানি হিসেবে পাচারণা চালান ইয়াবা গডফাদার কালু। মুলত প্রশাসনের চোখ ফাকি দিয়ে যাতে দোকান বসেই থেকে মাদকের জগত নিয়ন্ত্রন করা যায়। এরপর থেকে সেখানেই বসেই মুলত নিয়ন্ত্রন করেন মাদকের আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার কালু।
তিনি আরো বলেন, ইয়াবা গডফাদার কালু রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নানা মাধ্যমে রোহিঙ্গা সুন্দরী তরুনীদের টাকার লোভ দেখিয়ে তার মালিকাধীন সিএনজিতে করে কক্সবাজার শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেলে নিয়ে গিয়ে তাদের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পিস ইয়াবা সাপ্লাই দেন। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তার ফার্ণিচারের দোকানে বসেই। এতে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেন ফরিদ। এভাবেই কালুর পাশাপাশি ফরিদও এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। এছাড়াও কালু-ফরিদ হোটেল জোনের অর্ধ শতাধিক দাগী আসামীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যারা কালুর কথার বাইরে একটি ধাপ ফেলেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালুর নিজস্ব ৪০ টির মতো সিএনজি ও ৪টি মিনিট্রাক রয়েছে। মুলত সেগুলোর মাধ্যমে তিনি মাদক পাচার করেন। মাঝেমধ্যে তার গাড়ির ড্রাইভার ও পাচারকারী আটক হলেও বরাবরে কালু থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানায় ২০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে কালুর একটি মিনিট্রাকসহ পাচারকারি আটক হয়। ২০২১ সালের মাঝামাঝি চকরিয়ায় ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ কালুর আরোও একটি ট্রাক জব্দ করে র‍্যাব। আটকের পর পাচারকারিকে জামিনে ছাড়িয়ে নেয়া ও তার পরিবারের ভরণপোষণের চুক্তি থাকে বলে অধিকাংশ পাচারকারিরা মাদকের কালুর নাম প্রকাশ করেনা।
স্থানীয় এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, কালুর একটি ট্রাক কাগজপত্র সমস্যার কারণে চকরিয়া থানা জব্দ করেছে বলে দাবি করে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিতে আমাকে প্রস্তাব দেন। পরে আমি থানায় গিয়ে জানতে পারি ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ র‍্যাব গাড়িটি জব্দ করে থানায় হস্তান্তর করে। সেদিন থেকে জানতে পারি কালু কত বড়ো ইয়াবা গডফাদার। তার কথা মতো কাজ না করার কারণে কালু আমাকে নিয়ে নানান ষড়যন্ত্র শুরু করে। তখন কালুর বিরুদ্ধে থানা এবং র‍্যাবের কাছে অভিযোগও করেছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালু সদরের ঝিলংজার ৮ নং ওয়ার্ডের খরুলিয়া কোনার এলাকার দিনমজুর মনির আহাম্মদের ছেলে। শিশু বয়সে কালুসহ তার পরিবারের সদস্যরা রাখান ছেলে ও কুলি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিশোর বয়সে বিয়ে করে মাদক সন্ত্রাসী ফজল কবিরের মেয়েকে। পরবর্তী শশুর বাড়ির আত্মীয় ঘুমধুমের ইয়াবা ডন ফরিদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন কালু।
এদিকে, ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি কালুর ১০ হাজার ইয়াবার একটি চালান পাচারের সময় খরুলিয়া গরুর বাজার এলাকার ইয়াছিন ক্রোকারীজের দোকানের সামনে থেকে তার সমন্ধি কামাল ও তার ভাবী শামসুন নাহার প্রকাশ শহিসোনাব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) হাতে আটক হন। এই ঘটনায় মাদক প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে কালুর নাম।
স্থানীয়রা বলছেন, কালু ও ফরিদ তাদের শশুর বাড়ির মাদক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এখন কালু ও ফরিদের নেতৃত্বে কক্সবাজারে হোটেল জোনসহ দেশের কমপক্ষে ৪০টির বেশি স্পটে মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এতে প্রতিদিন খরুলিয়াতে লাখ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। আর সেই টাকার মোটা অংকের ভাগ পাচ্ছেন প্রভাবশালী মহলের মদতদাতারা।
স্থানীয়রা আরও বলছেন, কালুর শশুর ফজল কবির তার সমন্ধি বাহাদুরের মৃতুতে মাদক ব্যবসা ও বিক্রি বন্ধ হয়নি। শুধু মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক পরিবর্তিত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিহা জানিয়ে এক সিএনজি ড্রাইভার বলেন, আমি কালুর সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম। প্রথমে প্রথমে কালুর কথামতো তার মাদক বহন করেছি। একবার তার একটি মাদকের চালান নিয়ে ডিবি পুলিশের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছি। এতে তিনি আমাকে জামিনে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কালু কথা রাখেনি। এখন তার মাদক বহনের অনীহা জানালে গাড়িটি আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানে কালুর গুন্ডাবাহিনীর হুমকির মধ্যে আছি। আমার কাছ থেকে নেওয়া টাকাগুলো ফেরত দেন নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঘুমধুমে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের নিয়ন্ত্রক ছিলেন দুজন। একজন পুরাতন রোহিঙ্গা এবং অন্যজন কালুর সিন্ডিকেট প্রধান ফরিদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বন্দুকযুদ্ধে পুরাতন রোহিঙ্গা মারা যাওয়ার পর বদলে যায় সেখানকার পরিস্থিতি। বর্তমানে সেখানকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে আসে ফরিদের কাছে। তিনি গড়ে তোলেন মাদক ও অপরাধের বিশাল সাম্রাজ্য। আর মামলা-হামলা থেকে রক্ষা পেতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন রাজনীতিকদের সঙ্গে ছবি তুলে এবং ব্যানার ফেস্টুন সাঁটিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলতেন।
এলাকাবাসি জানান, কালু খরুলিয়া থেকে কেনদিন কোথাও যান না। এমনকি কৌশলগত কারণে প্যান্টও পরেন না। তাকে সবসময় বিভিন্ন বিকাশের দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা উঠাতে দেখা যায়।
স্থানীয় এক ব্যাক্তি বলেন, কিছুদিন আগে কোনার পাড়া এলাকায় সদর এসিল্যান্ডের গাড়ি যায় একটি অভিযানে। খবর পেয়ে কালু রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে তার বাড়িতে চলে যান। সেদিন হয়তো তার বাড়িতে বড় কোন মাদকের চালান মজুত করে রেখেছিলেন পাচারের উদ্দেশ্যে। কালু কথায় কথায় মানুষকে টাকা ও সম্পদের বড়াই করেন বলে জানান এই ব্যাক্তি।
সূত্রটি আরোও জানান, ফরিদ কুতুপালং ও বালুখালী এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে কালুর মালিকানাধীন গাড়িতে ফার্ণিচারের ভেতরে করে খরুলিয়া পাঠান।সেখান থেকে কালু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকের চালান পাচার করে থাকেন। প্রথমে কালু কিস্তিতে ড্রাইভারদের গাড়ি দেন। পরে তাকে মাদক পাচারের প্রস্তাব দেন, কেউ মাদক পাচারে অস্বীকৃতি জানালে তার কাছ থেকে গাড়ি কেড়ে নেন। এইসব অভিযোগ এনে সদর থানায় এক যুবক একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে কালুর একটি সিএনজি জব্দ করে পুলিশ। কয়েক ঘন্টা পর কালুর সিন্ডিকেটের লোকজন থানা পুলিশকে র‍্যাব পরিচয় দিয়ে গাড়িটি নিয়ে যায়। বর্তমানে ওই গাড়িটি সদর থানা পুলিশ পুরনায় জব্দ করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল আমিন প্রকাশ কালু মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে কয়েকটি গাড়ি ক্রয় করেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তার আয়-ব্যয়ে সামঞ্জস্য না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন সদোত্তর দিতে পারেন নি।

সদর থানার এএসআই শিবল বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে কালুর একটি গাড়ি থানায় জব্দ করা হয়েছে। থানাতে কালু না আসলেও গাড়িটি ছাড়িয়ে নিয়ে বিভিন্নভাবে তৎবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে থানায় আসতে কয়েকবার সময় দিলেও কালু থানায় আসেন না। এরআগেও প্রতারণা করে র‍্যাব পরিচয় দিয়ে গাড়িটি নিয়ে যায় কালু। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *