সংবাদ পরিবেশক
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মানবিক আশ্রয়ের স্থল হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালের বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতির পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ সরকারের উদার ব্যবস্থাপনায় এই শিবিরগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীরা বসবাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই মানবিক আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে এক উদ্বেগজনক অপরাধমূলক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
একটি প্রবাদ রয়েছে- “শান্তির নীড় যখন অসৎ উদ্দেশ্যের বলি হয়, তখন সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।” ঠিক তেমনি, কিছু উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্ষমতার লোভ এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে শরণার্থী শিবিরের সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবন আজ মারাত্মকভাবে বিপন্ন। সম্প্রতি নিষিদ্ধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠী আরএসও (RSO) এবং তাদের রাজনৈতিক জোট ইউআরডিএফ (URDF)-এর সদস্যরা ক্যাম্পের ভেতরে যেভাবে গোপন সভা ও উসকানিমূলক তৎপরতা শুরু করেছে, তা সমগ্র অঞ্চলে এক গভীর নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রাপ্ত তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কুতুপালং ক্যাম্প ৯ থেকে একটি সংঘবদ্ধ দল সুকৌশলে ক্যাম্প ৩-এর ইকরা ব্লকে প্রবেশ করে এবং সেখানে একটি গোপনীয় ও উসকানিমূলক বৈঠক সম্পন্ন করে।
এই গোপন সভার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালনকারী হিসেবে ক্যাম্প ৯-এর বেশ কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাঁরা হলেন- ক্যাম্প ৯-এর একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক কর্মী মুরশিদ (যিনি ফিরোজ খান নামেও পরিচিত), ক্যাম্প ৯-এর সাধারণ বাসিন্দা হলেও এই ধরনের গোপন তৎপরতার পেছনের সারির সংগঠক হিসেবে রয়েছেন মুহাম্মদ তারিক ও ক্যাম্প ৯-এর সক্রিয় সদস্য ও উসকানিদাতা মভি মুহাম্মদ নূরের নেতৃত্বে এই গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সভার মূল লক্ষ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং বিপজ্জনক। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ কিছু ভিডিও ফুটেজ ধারণ করা। উদাহরণস্বরূপ, এই ভিডিওগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী এআরএসএ (ARSA)-এর বিরুদ্ধে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মনে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ তৈরি করা।
এছাড়া সাধারণ দরিদ্র রোহিঙ্গাদের সহজে ভিড় করতে বাধ্য করার জন্য অভিনব কৌশল নেওয়া হয়। ক্যাম্প ৯ থেকে নির্দিষ্ট কিছু গরিব মানুষকে ক্যাম্প ৩-এর ইকরা ব্লকে ডেকে আনা হয় এবং উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে প্রলোভনস্বরূপ একটি করে ফয়েল ফুড প্যাকেট দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মূলত ত্রাণ বা খাবারের সংকটকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর মূল উদ্দেশ্য মানবিক সুরক্ষা এবং নিজ দেশ মিয়ানমারে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। কিন্তু একটি কুচক্রী সন্ত্রাসী চক্র নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সাধারণ রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে তুলেছে।
এ বিষয়ে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, “সাপ যেমন নিজের গর্তেই বিষ ছড়ায়, তেমনি এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ক্যাম্পের সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার মূলে নিজেই কোঠার মারছে।”
তারা আরও বলেন- রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কেবল আইনবিরোধীই নয়, বরং সমগ্র রোহিঙ্গা জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। সাধারণ রোহিঙ্গাদের শান্তিপ্রিয় মানসিকতাকে জিম্মি করে অস্ত্রবাজি ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকারী এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও আপসহীন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি সামনে আসার পর ক্যাম্পের ভেতরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, মাঝি-মেম্বার থেকে শুরু করে স্থানীয় এলাকাবাসী এবং সচেতন নাগরিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ক্যাম্প ৩-এর ইকরা ব্লকের একজন সাধারণ দিনমজুর ও সাধারণ রোহিঙ্গা বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- “আমরা মিয়ানমারের বুচিডং-মংডু থেকে পালিয়ে এসেছি শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য। আমরা কোনো ধরনের রাজনীতির মারামারি বা কাটাকাটি চাই না। কিন্তু এই রাজনৈতিক নেতারা সামান্য ফয়েল প্যাকেটের খাবারের লোভ দেখিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ব্যবহার করতে চায়। এদের এসব উসকানিমূলক কাজের কারণে দিনশেষে আমাদের সাধারণ রোহিঙ্গাদেরই জীবন বাজি রাখতে হয়।”
ক্যাম্প ৯-এর অপর এক সাধারণ রোহিঙ্গা নারী বলেন- “আমাদের স্বামী-সন্তানদের সারাদিন পেটের দায়ে কাজ খুঁজতে হয়। কিন্তু কিছু লোক এসে যখন মিটিংয়ের নামে ভিডিও করে এবং অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায়, তখন আমাদের মনে চরম ভয় কাজ করে। কারণ এর প্রতিশোধ হিসেবে রাতে ক্যাম্পে আবার খুনোখুনি শুরু হয়। আমরা সরকারের কাছে শান্তি চাই, এই সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।”
সরাসরি এই ধরনের গোষ্ঠীগত কোন্দল ও জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের শিকার হওয়া ক্যাম্প ৯-এর এক ভুক্তভোগী তরুণ বলেন- “গত ৩০ অক্টোবর যেসব লোকজনকে ক্যাম্প ৯ থেকে ক্যাম্প ৩-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকেই আমার পরিচিত। তাদের পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে মিটিংয়ে না গেলে ভবিষ্যতে ত্রাণ বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে। যারা প্রতিবাদ করতে গেছে, তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য জিম্মি দশার মধ্যে বসবাস করছি।”
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এক রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী বলেন- “গত কয়েক মাসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের ছোট্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রাতে হঠাৎ করে গুলির শব্দ ও হামলা হয়, যার ফলে আমাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সন্ত্রাসীরা নিজেদের আধিপত্যের জন্য আমাদের মতো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে।”
ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন জ্যেষ্ঠ মাঝি (ব্লক লিডার) অত্যন্ত উদ্বেগের সুরে জানান- “আমাদের ক্যাম্পের ভেতরে বহিরাগত বা অন্য ক্যাম্পের লোক এনে এ ধরনের গোপন রাজনৈতিক সভা করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আত্মঘাতী। আরএসও বা ইউআরডিএফ-এর নাম ভাঙিয়ে যারা এআরএসএ-র বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছে, তারা মূলত ক্যাম্পে একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বাধাতে চায়। মাঝি হিসেবে আমরা সাধারণ মানুষকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু এভাবে গোপনে মিটিং চলতে থাকলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
ক্যাম্প ৯-এর একজন ব্লক মেম্বার বলেন- “ব্লক পর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দ দেখতে চেষ্টা করি। কিন্তু যখন কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ যুবকদের ভুল বুঝিয়ে মিটিংয়ে নিয়ে যায় এবং ফয়েল প্যাকেটের লোভ দেখায়, তখন আমাদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের উচিত এই ধরনের ব্লকভিত্তিক গোপন বৈঠক চিরতরে বন্ধ করা।”
উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় এলাকাবাসীর একজন প্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- “আমরা স্থানীয় বাঙালিরা প্রথম থেকেই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরে প্রতিনিয়ত যেভাবে অস্ত্রবাজি, মাদক ব্যবসা আর গোপন মিটিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তাতে আমরা আমাদের স্থানীয় সমাজ ও চলাফেরা নিয়ে আতঙ্কিত। ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব আমাদের স্থানীয় এলাকাবাসীর ওপরও পড়ে।”
কক্সবাজারের একজন সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মী বলেন- “রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যা ঘটছে, তা কেবল তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে আরএসও ও অন্যান্য উগ্রপন্থী চক্রের রাজনৈতিক তৎপরতা কঠোর হাতে দমন না করলে আগামী দিনে পুরো সীমান্ত অঞ্চলে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। সুশীল সমাজ হিসেবে আমরা চাই প্রশাসন এখানে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করুক।”
আইনি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরনের ঘটনাগুলো যদি সময়মতো দমন না করা হয়, তবে তা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। দেশের প্রচলিত আইন ও শরণার্থী শিবিরের বিধিমালা লঙ্ঘন করে সশস্ত্র সংগঠনের রাজনৈতিক সভা পরিচালনা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। এআরএসএ এবং আরএসও/ইউআরডিএফ-এর মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ ও উসকানি একসময় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার বলি হবে সাধারণ নারী ও শিশুরা। এছাড়া নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দেশি-বিদেশি এনজিও ও মানবিক সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুতুপালং ক্যাম্প ৩-এর ইকরা ব্লকে আরএসও/ইউআরডিএফ-এর রাজনৈতিক সদস্যদের গোপন সভা এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভঙ্গুর নিরাপত্তার ওপর একটি অশনি সংকেত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মত দিয়েছেন।
যৌথ ও সাঁড়াশি অভিযান: ক্যাম্প ৩, ক্যাম্প ৯ এবং আশেপাশের সন্দেহজনক ব্লকগুলোতে অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর জোরালো সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এবং চিহ্নিত অভিযুক্ত মুরশিদ (ফিরোজ খান), মুহাম্মদ তারিক এবং এমভি মুহাম্মদ নূর-সহ জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনের কঠোর ধারায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরের অভ্যন্তরে সব ধরনের রাজনৈতিক গ্যাং, উসকানিমূলক প্রচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর আনাগোনা চিরতরে বন্ধ করতে এপিবিএন (APBn) ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের টহল জোরদার করতে হবে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করার স্বার্থে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
