মো: মিজবাহ উদ্দীন ইবাদ :

“আইন মেনে সড়কে চলি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি”-এই প্রতিপাদ্য ও দৃঢ় অঙ্গীকারকে সামনে রেখে কক্সবাজারে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) কক্সবাজার জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা বর্ণাঢ্য ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

 

কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল প্রাঙ্গণে এক উদ্বোধনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। উদ্বোধন শেষে বাস টার্মিনাল থেকে একটি বিশাল ও বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক পরিক্রমণ করে। র‌্যালিতে জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, নিসচার নেতাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি ব্যানার ও সচেতনতামূলক ফেস্টুন হাতে অংশ নেন। র‌্যালি শেষে বাস টার্মিনাল মিলনায়তনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রদর্শিত হয়।

 

উক্ত অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- কক্সবাজার জেলা তথ্য অফিসার মোহাম্মদ আবদু ছাত্তার, কক্সবাজার বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, নিসচা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি জসিম উদ্দিন কিশোর, ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা জানে আলম ভুইয়া, নিসচা কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হাকিম আলী, উপদেষ্টা নুরুল ইসলাম হেলালী ও মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল, সহ-সভাপতি নুরুল আমিন ও আমিরুল ইসলাম দুলু এবং প্রবীণ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শামসুল হক শারেক ও মোর্শেদুর রহমান খোকন প্রমূখ।

 

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ও আয়োজক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে আইন মান্য করা এবং সচেতনতা সৃষ্টির ওপর আলোকপাত করে বক্তব্য প্রদান করেন। নিসচা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি জসিম উদ্দিন কিশোর বলেন- “প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, বরং একটি গোটা পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। একটি অকাল মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কেবল প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপ বা কঠোরতার ওপর নির্ভর করে সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে পারব না, যতক্ষণ না আমাদের চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানো, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে ড্রাইভিং না করা এবং ওভারটেকিংয়ের পথ ছাড়ার মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পথচারীদের ফুটপাত ভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবনের সুরক্ষায় কাজ করছে। আসুন, আমরা সবাই শপথ নিই-আইন মানব, নিজেকে এবং অপরকে সুরক্ষিত রাখব।”

 

কক্সবাজার বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান- “একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ চালক, যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত যানবাহন এবং চালকদের আইন মানার মানসিকতা। বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেল নিয়মিতভাবে ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে এবং ভুয়া লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আমরা চালকদের পেশাগত দক্ষতাবৃদ্ধি ও ট্রাফিক সাইন-সংকেত বোঝাতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো চালকদের আত্মসচেতনতা। প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো ও অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহনের মানসিকতা ত্যাগ না করলে দুর্ঘটনার হার কমানো কঠিন হবে। আমাদের লক্ষ্য নিশ্চিত করা যে, প্রতিটি গাড়ি যেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়।”

 

কক্সবাজার জেলা তথ্য অফিসার মোহাম্মদ আবদু ছাত্তার বলেন- “সড়ক নিরাপত্তায় আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো ব্যাপক জনসচেতনতা। অসচেতনতা ও তাড়াহুড়ো করার প্রবণতাই অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। শহর থেকে শুরু করে দূরবর্তী গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত ট্রাফিক আইন ও নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। গণযোগাযোগ মাধ্যম এবং আমাদের জেলা তথ্য অফিসের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সড়ক ব্যবহারবিধি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত অবহিত করা হচ্ছে। তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে নিরাপদ ও দুর্ঘটনামুক্ত। তথ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা তথ্য অফিস এ কাজে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে।”

 

আলোচনা সভা শেষে বাস টার্মিনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত শত শত বাস চালক, হেলপার, কাউন্টার স্টাফ ও সাধারণ যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বিআরটিএ ও নিসচার যৌথ নির্মিত বিশেষ সচেতনতামূলক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এতে অতিরিক্ত গতির ভয়াবহতা, হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব, লেন মেনে চলা এবং অসাবধানতার করুণ পরিণতি তুলে ধরা হয়, যা উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর প্রভাব ফেলে।

 

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল একদিনের আয়োজন বা স্লোগানই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন ৩৬৫ দিনই দায়িত্বশীল আচরণ ও ট্রাফিক নিয়মের প্রতি অনুগত থাকা। কক্সবাজারে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও নিসচার এই যৌথ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাঝে ইতিবাচক সচেতনতার উন্মেষ ঘটাবে। সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে একটি দুর্ঘটনামুক্ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ সড়ক উপহার দিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *