শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৪:১৮ অপরাহ্ন
Logo

সরকারি ভবন ভেঙে মার্কেট নির্মাণের তোড়জোড় চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহর

দৈনিক মেহেদী / ২৬ ভিউ টাইম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

বিশেষ প্রতিবেদক:

কক্সবাজার সদরের পিএমখালীর প্রাচীনতম নূর মোহাম্মদ চৌধুরী বাজার। ঐতিহ্যবাহী বাজারটির পোষ্ট অফিসসহ সরকারি পরিত্যাক্ত একাধিক ভবন ভেঙে দখলের তোড়জোড় শুরু করেছে প্রভাবশালীরা। ক্ষমতার প্রভাব কাটিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ সরকারি ভবনগুলো গুঁটিয়ে দিয়ে দখলের পর ওই জায়গায় ব্যক্তিগত মার্কেট নির্মাণের উদ্দ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ। এরই মধ্যে বহিরাগত দাগী সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে সরকারি ভবন ভাঙচুরে মহড়া দিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পোষ্ট অফিসসহ পরিষদের পরিত্যাক্ত ভবনের মূল গেট তালা দেওয়া। ভবনের ছাদে বড় হাতুড়ি ও ড্রিল মেশিনসহ যন্ত্রপাতি দিয়ে ভবন ভাঙার কাজ করছেন ৬-৮ জন শ্রমিক। মূল ভবনের পেছনে ছোট্ট যে পুরোনো ১ তলা ভবন ছিল, সেটি আগেই পুরোপুরি ভাঙা হয়ে গেছে। সেখানে পড়ে আছে ইটসহ ভাঙা ভবনের কিছু অংশ। ইতিমধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে ব্যবহৃত লোহার রডও। অনেকেই কৌতুহলবশত দাঁড়িয়ে পরিষদ ও পোষ্ট অফিস ভাঙার কার্যক্রম দেখছেন। কেন, কী কারণে ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। সামনে প্রভাবশালীরা ত্রাস সৃষ্টি করে মহড়া দিচ্ছে যাতে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস না পাই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার প্রভাব কাটিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নূর মোহাম্মদ চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত ভবনগুলো ভেঙে উন্নয়নের নাম দিয়ে ব্যক্তিগত মার্কেট তৈরী করতে এমন বেপরোয়া কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন। আব্দুল্লাহর অদৃশ্য শক্তির কাছে পুরো পিএমখালীর লোকজন অসহায় হয়ে পড়েছেন।

এই ঘটনায় সদর উপজেলা এসিল্যান্ড ঘটনাস্থলে এসে সরকারি ভবন ভাঙতে নিষধ করলেও তা তিনি কর্ণপাত করেনি। কিছুক্ষণ ভবন ভাঙার কাজ বন্ধ রাখলে এসিল্যান্ড চলে যাওয়ার পর পর পুনরায় শুরু করে ভাঙার কাজ।

সেই পোষ্ট অফিস ও পরিষদ ভবন ভেঙে সবাইকে নতুন দোকান দেওয়ার প্রচারনা চালিয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ পরিকল্পনার কথা অনেকের সাথে শেয়ারও করেছেন, একটি নয়, পুরোটাই ভাঙা হচ্ছে ভবনগুলোর অংশ। ইতোমধ্যে আব্দুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন ভবনগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে সদর উপজেলার ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিনের যোগসূত্রে। সেখানে সরকারি বরাদ্ধের কোটি কোটি টাকা খরচ করে ৩ তলা বিশিষ্ট ভবন করে ভাড়া দেবেন। ইতিমধ্যে অনেকের সাথে চুক্তিও করেছেন সেভানে।

ইতিহাস বলছে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী নূর মোহাম্মদ চৌধুরী ছিলেন পিএমখালীর একজন জমিদার। পাহাড় ঘেরা জনপদে জাদরেল এই জমিদার নিজের জমিতে বাসান একটি বাজার। যার নামকরণ হয় নূর মোহাম্মদ চৌধুরীর নামের। একসময় বাজারটি খুব জমজমাট এবং জনবহুল ছিলো। আশেপাশে তেমন কোন পরিচিত বাজার না থাকায় পণ্য বেচাকেনায় সেসময় দুরদুরান্তের লোকজনের কাছে এটিই ছিলো একমাত্র ভরসা। লোকসমাগমকে কেন্দ্র করে তৎকালিন সরকার বাজারটির পাশে পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং পোষ্ট অফিস নির্মাণ করে। যুগযুগ ধরে বাজারটির পাশে পরিষদ ও পোষ্ট অফিসের কার্যক্রম চালে আসলেও কালের পরিক্রমায় একসময় বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন বাজার বসে। ফলে কার্যক্রম কমতে থাকে নূর মোহাম্মদ চৌধুরীর বাজারটির। গত দুই যুগ আগে পিএমখালী-খুরুশকুল সড়কের পাশের চেরাংঘর বাজার সংলগ্ন এলাকায় পরিষদের নতুন ভবন স্থানান্তর করা হয়। এরপর পুরোনো ভবনটি কৃষকদের সারের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আব্দুল্লাহ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ভবনগুলোসহ জায়গাটির উপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার। এটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি। মাসকয়েক আগে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে উপজেলা প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ভবন ভাঙার কার্যক্রম শুরু করলে স্থানীয়রা বাধা দেন। বিষয়টি তৎকালিন ইউএনও সম্রাট খীষা অবগত হলে কাজটি বন্ধ করে দেন। কিছুদিন ভবন ভাঙা বন্ধ রাখলেও গতকাল বুধবার (১৭ এপ্রিল) সকালে নিজস্ব শ্রমিক দিয়ে ফের ভবন ভাঙার কাজ শুরু করেন।

স্থানীয় নজির আহমদ, সাইফুল, হারুণ, জুয়েল, শহিদুল্লাহসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, পিএমখালীর ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হন নূর মোহাম্মদ চৌধুরী। আর তার প্রাসাদোপম ভবনটি পরিণত হয় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রস্থলে। আজও বহু মানুষ বাজারটির এই ভবনের সামনে একবার ঢুঁ মারতে ভোলেন না। একসময়ের জনপ্রিয় বাজারটি তিনি গড়ে তোলেন তার জামিতে। পোষ্ট অফিস, পরিষদ ভবন, সার রাখার সব ব্যবস্থার পাশাপাশি নান্দনিকতার ছোঁয়ায় ভরপুর ছিল ভবনটিতে।

তাদের দাবি, কালো টাকা ছিটিয়ে আব্দুল্লাহ চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে পিএমখালীর ব্যক্তিমালিকানা, খাস জমিসহ পাহাড় দখল যেন তার নেশায় পরিণত হয়েছে। একসময়ের রিক্তহস্ত আব্দুল্লাহ টাকা কুমির বনে মুর্তিমাণ আতংক হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের কাছে। আর এই কালো টাকা ছিটিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই যেকোন কিছুই করে চলেছেন। তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেন স্থানীয়রা।

সদর উপজেলার নির্বাহী কমকর্তা (ইউএনও) ফারজানা রহমান বলেন, পরিত্যাক্ত হলেও সরকারী কোন ভবন কিংবা ঝুপড়ি ব্যক্তিগতভাবে কেউ হাত দিতে পারেনা। পোষ্ট অফিসসহ পরিষদের ভবন ভাঙার বিষয়টি অবগত হওয়ার সাথে সাথে এসিল্যান্ডকে পাঠিয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহকে সতর্ক করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর যদি তিনি আবার ভবন ভাঙার কাজ করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আরো নিউজ বিভন্ন বিভাগের

আমাদের ফেইজবুক লাইক দিন

বাংলাদেশের মানচিত্র

Theme Customize By Monsur Alam